শিরোনাম

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে

 প্রকাশ: ৩১ মে ২০২১, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন   |   নৌবাহিনী প্রধান


সমুদ্রের উপর এবং নিচে সব ধরনের হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা, সামুদ্রিক স্বার্থ উন্নত, সমুদ্র শাসনে সহায়তাসহ জাতীয় কূটনৈতিক উদ্দেশ্যে অবদান রাখা এবং সমুদ্রে যেকোনো সংঘাতে কার্যকর অবস্থান নিশ্চিতে যাত্রা শুরুর পর থেকেই কাজ করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। জাতীয় সমুদ্রসীমার অর্থনৈতিক কার্যক্রম তথা সমুদ্রপৃষ্ঠে সুশাসন নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রণমূলক এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ কার্যক্রম গ্রহণে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যেও নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে এ বাহিনী।


 
যে কাজগুলোই এ বাহিনীর ভিশন ও মিশন। পাশাপাশি ২০১০ সালে সরকার সশস্ত্রবাহিনীর জন্য ফোর্সেস গোল ২০৩০ নামক দীর্ঘমেয়াদি একটি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যে পরিকল্পনায় বঙ্গোপসাগরের ভূকৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে নৌবাহিনীকে দেয়া হয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব।

ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি সুসজ্জিত ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে রূপ দেয়ার পরিকল্পনাও নেয়া হয়, যা দেশের সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় শতভাগ ভূমিকা রাখবে।


 
বাহিনীর আকার বৃদ্ধি, আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণের বিষয়েও জোর দেয়া হয় ওই পরিকল্পনায়। ফোর্সেস গোল ২০৩০ অনুসারে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়ে দুটি টাইপ ০৩৫জি ডুবোজাহাজ, দুটি টাইপ ০৫৩এইচ২ ফ্রিগেট, দুটি হ্যামিল্টন ক্লাস ফ্রিগেট, চারটি টাইপ ০৫৬ কর্ভেট, চারটি দুর্জয় ক্লাস প্যাট্রল ভেসেল, পাঁচটি পদ্মা ক্লাস প্যাট্রল ভেসেল, একটি তেলবাহী ট্যাংকার, দুটি ডরনিয়ার ডিও-২২৮এনজি মেরিটাইম টহল বিমান, দুটি এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার।


 
শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকারপ্রধানের অসামান্য অবদান ও পৃষ্ঠপোষকতায় দুটি সাবমেরিন সংযোজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিতও হয়েছে।

এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নে যুক্ত হয়েছে নতুন স্থাপনা, আধুনিক নৌ ঘাঁটি, প্রশাসনিক ভবন, বাসভবন ও আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স এবং নবীন নাবিক প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়ের মতো বৃহৎ ও উন্নতমানের প্রশিক্ষণ স্থাপনা।

তাছাড়া নিজস্ব সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে খুলনা শিপইয়ার্ডে ইতোমধ্যেই নির্মিত হয়েছে দুটি লার্জ পেট্রোল ক্রাফট। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ড্রাইডকে ছয়টি আধুনিক ফ্রিগেট তৈরির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ভিশন-মিশন ও ফোর্সেস গোল ২০৩০ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে সুপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ নৌ বাহিনী এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে।


 
সবমিলিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠে ধারাবাহিকভাবে অসংখ্য অবদান রাখা বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পরিচালনায় সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনার অধিকারী ও নেতৃত্ব প্রদানে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিকেই প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে আসছে সরকার। যাত্রা শুরুর পর থেকেই সেরকম গুণাবলিবিশিষ্টদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে নৌবাহিনী।

এর ধারাবাহিকতায় সবশেষ গত ২৫ জুলাই এ বাহিনী প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন দীর্ঘ ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে দৃষ্টান্তমূলক সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনকারী রিয়ার এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল, এনবিপি, এনইউপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি। আগামী তিন বছরের জন্য যিনি নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করবেন।


 
শুধু সামরিক সক্ষমতাই নয়, ২০১৭ সালে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পুনর্বাসনের জন্য ভাসানচর প্রকল্পের বাস্তবায়নে রিয়ার এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে প্রকল্পের পরিকল্পনা, তদারকি ও বাস্তবায়ন কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা মোতাবেক প্রকল্প সূচনার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য একটি প্রত্যন্ত দ্বীপকে বাসযোগ্য করে তোলার মাধ্যমেও তিনি সর্বমহলের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন।

দায়িত্ব গ্রহণ করেই পেশাদারিত্ব, সততা ও একনিষ্ঠতার জন্য বাহিনীর সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও নাবিকদের নিকট সুপরিচিত এম শাহীন ইকবাল তার দীর্ঘ ৪০ বছরের কর্মজীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচালনা করছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী। বর্তমান নৌপ্রধানের দীর্ঘ ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কেই পাঠকদের জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করছে আমার সংবাদ।

নৌবাহিনীপ্রধান রিয়ার এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল ১৯৮০ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করে। ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে এক্সিকিউটিভ শাখায় কমিশন লাভ করেন।

এরপর থেকেই দীর্ঘ ৪০ বছরের কর্মজীবনে ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শন করে আসছেন দৃষ্টান্তমূলক সামরিক সক্ষমতা। পেশাদারিত্ব, সততা ও একনিষ্ঠতার জন্যই যিনি গোটা বাহিনীর সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও নাবিকদের নিকট সুপরিচিত।

নৌবাহিনী ফ্রিগেটসহ সকল শ্রেণির জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি কমান্ড করার পাশাপাশি তিনি নৌ সদরে সহকারী নৌ প্রধান (অপারেশান্স), সহকারী নৌ প্রধান (পার্সোনেল), পরিচালক নৌ অপারেশান্স, পরিচালক নৌ গোয়েন্দা, চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলের আঞ্চলিক কমান্ডার, খুলনা নৌ অঞ্চলের আঞ্চলিক কমান্ডার, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে পালন করেন। চাকরি জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের গুণাবলি, সুদূরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা, আন্তরিকতা ও সততার ছাপ রেখেছেন তিনি।  

এম শাহীন ইকবাল তার দীর্ঘ চাকরিজীবনে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ ও সামরিক কৌশলগত শিক্ষা অর্জন করেন। প্রতিটি প্রশিক্ষণেই রয়েছে তার উচ্চতর গ্রেডিং অর্জন এবং কৃতিত্বের স্বাক্ষর। যে কারণে সর্বোচ্চ প্রশংসাসহ নানা ধরনের সম্মানেও ভূষিত হন তিনি।

তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেভাল স্টাফ কোর্স, মেরিটাইম কম্পোনেন্ট কমান্ডার ফ্ল্যাগ অফিসার কোর্স, ইন্টারন্যাশনাল সারফেস ওয়ারফেয়ার কোর্স, ভারত থেকে এন্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার কোর্স এবং মিরপুর ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ  থেকে এনডিসি কোর্সসহ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন।

চাকরি জীবনে রিয়ার এডমিরাল এম শাহীন ইকবাল জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিশেষ অবদান রাখেন। তার মধ্যে ২০১৩ সালে খুলনা নৌ অঞ্চলের আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচারক ও বিশ্লেষক দলের সঙ্গে কাজ করেন এবং তাদের সুরক্ষাও শতভাগ নিশ্চিত করেন তিনি।

জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, মিয়ানমার-টেকনাফ মাদক এবং মানবপাচার রোধে বিশেষ অবদানসহ জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেন।

বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে এম শাহীন ইকবাল আন্তর্জাতিক মেরিটাইম পরিমণ্ডলে একাধিকবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, ভারত, সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও সামরিক প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। তার অসামান্য একাডেমিক সাফল্য ও পেশাদারিত্বের জন্য নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদক (এনবিপি) এবং নৌ উৎকর্ষ পদকেও (এনইউপি) ভূষিত হন।

রিয়ার এডমিরাল এম শাহীন ইকবালের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা, সাধারণ জীবনযাপন এবং অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা নৌবাহিনীর সর্বস্তরের প্রতিটি সদস্যদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার উৎস। তার সুদক্ষ নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় আগামীদিনে ত্রিমাত্রিক বাংলাদেশ নৌবাহিনী আরও সমৃদ্ধ হবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।